√√~ হেবা সম্পত্তি বলতে কী বুঝায় ??
উত্তর :- কোনো সম্পত্তি দান করাকে মুসলিম আইনে হেবা বলে। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ এর ১২২ ধারায় বলা হয়েছে, "কোন সম্পত্তি দাতা কর্তৃক কোন ব্যক্তিকে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে এর কোন পণ গ্রহণ না করে তাৎক্ষণিকভাবে হস্তান্তর করলে এবং গ্রহীতা বা তার পক্ষে কোন ব্যক্তি সেটি গ্রহণ করলে তাকে সম্পত্তি দান বা হেবা সম্পত্তি বলে।"
√√~ হেবা / দানের উপাদানসমূহ :-
১) দাতার জীবনকালের মধ্যে হেবা কার্য সম্পন্ন হতে হবে।
২) হেবা গ্রহণের পূর্বে দাতার মৃত্যু হলে হেবা বাতিল বলে গণ্য হবে।
৩) হেবার সময় সম্পত্তিতে দাতার মালিকানা ও দখল থাকতে হবে।
৪) হেবা স্বেচ্ছায় এবং পণবিহীন হতে হবে।
৫) দাতাকে অবশ্যই সুস্থ মস্তিস্ক সম্পন্ন এবং সাবালক হতে হবে।
৬) দান গ্রহীতা মানসিক ভারসাম্যহীন বা নাবালক হলে তার পক্ষে অভিভাবক হেবা গ্রহন করতে পারবেন।
৭) মুসলিম আইন অনুযায়ী দাতা তার সমুদয় সম্পত্তি যে কাউকে দান করতে পারেন। তবে দায়ভার মতে, একজন হিন্দু যাদের ভরণপোষণে আইনত বাধ্যবাধকতা আছে তাদের জন্য উপযুক্ত বব্যস্থা রাখার পর বাকী সম্পত্তি দান করতে পারেন।
৮) দখল হস্তান্তরের পূর্বে হেবা প্রত্যাহার করা যায়। কিন্তু, দখল হস্তান্তরের পরে হেবা প্রত্যাহারের জন্য আদালতের ডিক্রী লাগবে।
√√~ হেবা / দান বৈধ হওয়ার শর্তবলী :-
১) দাতা কর্তৃক হেবার ঘোষণা প্রদান।
২) গ্রহীতা বা তার পক্ষ হতে হেবা গ্রহন করা।
৩) দাতা কর্তৃক গ্রহীতাকে দানকৃত সম্পত্তির দখল প্রদান। অর্থাৎ, হেবা গ্রহণের পূর্বেই গ্রহীতা মারা গেলে হেবা / দান বাতিল হয়ে যাবে।
√√~ হেবা দলিল কি বাতিলযোগ্য ??
উত্তর :- দখল হস্তান্তরের পূর্বেই কেবল হেবা দলিল বাতিল করা যায়।
√√~ লিখিত দলিল ও রেজিস্ট্রি দলিল ছাড়া হেবা করা যায় কী ??
উত্তর :- মুসলিম আইন অনুযায়ী হেবা করতে লিখিত দলিলের প্রয়োজন নেই, রেজিস্ট্রি করারও প্রয়োজন নেই। তবে লিখিত দলিল থাকলে বা রেজিস্ট্রি করলে তা প্রমাণে সহজ হয়। তবে দানের ক্ষেত্রে লিখিত দলিল এবং তা রেজিস্ট্রি করা প্রয়োজন।
√√~ হেবাকৃত সম্পত্তির নামজারি :-
হেবার জন্য লিখিত কাগজের প্রয়োজন নেই। হেবাকৃত সম্পত্তি নামজারি করতে হলে দখল, স্থানীয় তদন্ত ও সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হেবা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নামজারি করতে পারেন। দখল হস্তান্তরের উৎকৃষ্ট প্রমাণ নামজারি। দলিলে হস্তান্তরের বিষয়টি উল্লেখ করলেও তা দখল হস্তান্তরের প্রমাণ নয়।
জনৈক রফিকুল্লাহ তাঁর ছেলের স্ত্রী নূরজাহান বেগমকে ১৯১৬ সালে লিখিত দলিলের মাধ্যমে একটি সম্পত্তি হেবা করেন। ১৯৪২ সাল পর্যন্ত জমিটি মিউটেশন হয়নি। মিউটেশন প্রসিডিং চলাকালে রফিকুল্লাহ মৃতু্যবরণ করেন। এ বিষয়ে কোর্ট সিদ্ধান্ত প্রদান করে যে হেবা করা হয়েছে, গ্রহীতা সম্মতি দিয়েছে; তবে দখল হস্তান্তরের বিষয়টি প্রমাণিত হয়নি। হেবা করার পর রফিকুল্লাহ জমিটির দখলে ছিল এবং গ্রহীতা দূরে থাকার কারণে বাস্তব দখল গ্রহণ সম্ভব ছিল না। কোর্ট সিদ্ধান্ত প্রদান করে যে হেবাটি সম্পন্ন হয়নি বিধায় তা বাতিল।
❂❂ নিম্নলিখিত ক্ষেত্রগুলো বিদ্যমান থাকলে হেবা দলিল বাতিল করা যায় না.... যথা:-
১) হেবাকৃত সম্পত্তির দাতা-গ্রহীতা স্বামী বা স্ত্রী হইলে।
২) গ্রহীতা মৃত্যূবরণ করলে।
৩) দাতা-গ্রহীতার মধ্যে বিবাহ অযোগ্য সম্পর্ক বিদ্যমান থাকলে,
৪) হেবাকৃত সম্পত্তি গ্রহীতা কর্তৃক বিক্রি বা হস্তান্তরিত হয়ে গেলে।
৫) হেবাকৃত সম্পত্তি বিলীন বা ধ্বংস হয়ে গেলে।
৬) হেবাকৃত সম্পত্তির মূল্য বেড়ে গেলে।
৭) হেবাকৃত সম্পত্তির প্রকৃতি সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে গেলে।
৮) হেবাটি "'হেবা বিল এওয়াজ"" (বিনিময়ে দান) হয়ে থাকলে হেবা দলিল যায় না।
★★★ উল্লেখিত ক্ষেত্রগুলো বিদ্যমান না থাকলে আদালতের মাধ্যমেও হেবা দলিল বাতিল করা যায়।
√√~ হেবা দলিলের মাধ্যমে প্রাপ্ত জমি কি বিক্রয়যোগ্য ??
উত্তর :- হেবাকৃত জমি গ্রহীতা বিক্রিসহ যেকোনো ভাবেই হস্তান্তর করতে পারবে।
❂❂ হেবা দলিলের রেজিস্ট্রি ফি সংক্রান্ত তথ্য:-
১) বিক্রয়যোগ্য সম্পত্তির বিক্রয়মূল্য ৫,০০,০০০/- (পাঁচ লক্ষ) টাকা পর্যন্ত হলে রেজিস্ট্রি ফি হবে ৫০০/- (পাঁচশত) টাকা।
২) বিক্রয়যোগ্য সম্পত্তির বিক্রয়মূল্য ৫,০০,০০০/- (পাঁচ লক্ষ) টাকার বেশি এবং ৫০,০০,০০০/- (পঞ্চাশ লক্ষ) টাকা পর্যন্ত হলে রেজিস্ট্রি ফি হবে ১ হাজার (এক হাজার) টাকা।
৩) বিক্রয়যোগ্য সম্পত্তির বিক্রয়মূল্য ৫০,০০,০০০/- (পঞ্চাশ লক্ষ) টাকার বেশি হলে রেজিস্ট্রি ফি হবে ২,০০০/- (দুই হাজার) টাকা।
৪) তবে মুসলিম আইন অনুযায়ী স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা, সন্তান, দাদা-দাদি, নাতি-নাতনি, সহোদর ভাই, সহোদর বোন, সহোদর ভাই-বোনের মধ্যে হেবা বা দান দলিলের রেজিস্ট্রি ফি মাত্র ১০০/- (একশত) টাকা।
√√~ স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে হেবা করার নিয়ম কী ??
উত্তর:- দাতা ও গ্রহীতা দানকৃত সম্পত্তিতে বসবাস করলে কিভাবে দখল হস্তান্তর বোঝানো হয়, তা আগের অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে। স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে দান করলে একই নিয়মে দখল হস্তান্তর বোঝাতে হবে। যদি সম্পত্তি ভাড়া দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে ধরে নিতে হবে, দানের পর স্ত্রীর পক্ষে স্বামী ভাড়া আদায় করে থাকবেন। স্বামী যদি অস্থাবর সম্পত্তি অপ্রাপ্ত বয়স্ক স্ত্রীকে রেজিস্টার্ড দলিল মূলে দান করে যে স্ত্রী ভালো মন্দ বুঝতে পারে এরূপ দান বৈধ।
√√~ হেবাকৃত সম্পত্তি ভাড়াটিয়ার দখলে থাকলে কীভাবে তার দখল হস্তান্তরিত হবে ??
উত্তর:- এ ক্ষেত্রে দাতা যদি ভাড়াটিয়াকে সম্পত্তির ভাড়া গ্রহীতা বরাবর প্রদানের অনুরোধ করে বা জমির মালিকানাসংক্রান্ত কাগজপত্র গ্রহীতাকে দিয়ে দেয়, অথবা গ্রহীতা বরাবর নামজারি করা হয়। তবে দখল হস্তান্তরিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে।
√√~ হেবাকারী ও গ্রহীতা যদি দানকৃত সম্পত্তিতে যৌথভাবে বসবাস করে, তবে দখল কিভাবে হস্তান্তরিত হবে ??
উত্তর:- এ ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক দখল হস্তান্তর সম্ভব নয় এবং প্রয়োজনও নেই। দাতা যদি এমন কোনো কাজ করেন, যা থেকে তাঁর দখল হস্তান্তরের ইচ্ছা প্রকাশিত হয়, তাহলেই দখল হস্তান্তর হয়েছে বলে ধরে নিতে হবে। নামফলক পরিবর্তন, নামজারি, সম্পত্তির বিবরণীতে উল্লেখ করা, আয়কর বিবরণীতে উল্লেখ করা ইত্যাদি দাতা তাঁর ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারেন।
√√~ নাবালককে দান করলে কিভাবে হস্তান্তরিত হবে ??
উত্তর:- নাবালকের পক্ষে তার অভিভাবকের কাছে দখল হস্তান্তরিত হলে দান সম্পন্ন হবে। নাবালকের সম্পত্তির অভিভাবক হচ্ছে তার বাবা। বাবার অবর্তমানে বাবা কর্তৃক নিয়োজিত ব্যক্তি, তাদের অবর্তমানে দাদা বা দাদা কর্তৃক নিয়োজিত ব্যক্তি।
√√~ বাবা বা অভিভাবক কর্তৃক নাবালককে দান করলে কীভাবে দখল হস্তান্তর করতে হয় ??
উত্তর:- এক্ষেত্রে দখল হস্তান্তরের প্রয়োজন নেই। দান করার ইচ্ছা এবং ঘোষণাই এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট। যে সম্পত্তি বিভাজন করা যায় না, তা একাধিক ব্যক্তিকে দান করা যায় কি?
যেহেতু দানের জন্য দখল হস্তান্তর একান্ত প্রয়োজন, কাজেই বিভাজন করা যায় না বা সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত সুবিধাদি বিভাজন করা যায় না এমন সম্পত্তি একাধিক ব্যক্তিকে দান করা যায় না। ভবিষ্যতে বিক্রি করতে পারবে না এমন শর্ত যুক্ত করে দান।
ধরা যাক, কোনো ব্যক্তি একটি সম্পত্তি দান করলেন এবং শর্তযুক্ত করে দিলেন যে ভবিষ্যতে গ্রহীতা সম্পত্তিটি বিক্রি করতে পারবেন না বা নির্দষ্টি কোনো ব্যক্তির কাছে ভাড়া দিতে পারবেন না এবং এমন অন্য কোনো শর্ত যুক্ত করে দিলেন। এ ক্ষেত্রে দানটি সম্পন্ন হয়েছে, তবে শর্তগুলো বাতিল বলে গণ্য করতে হবে।
√√~ ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর হেবা করার নিয়ম কী ??
ভিন্ন ধর্মাবলম্বীকে দানে আইনগত কোনো বাধা নেই। তবে একজন মুসলমান ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক অন্য একজন মুসলমানকে যে দান করেন, তা হচ্ছে হেবা; এই হেবা শুধু দুজন মুসলমানের মধ্যেই হতে পারে।
~ ধন্যবাদ ~